Insight Desk
প্রকাশ : Jul 31, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশের রঙ্গিন বিপ্লব ও জাতিসংঘের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা

নিজস্ব প্রতিবেদক

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে সংঘটিত জুলাই আন্দোলন, যা শুরুতে কোটাবিরোধী আন্দোলন হিসেবে পরিচিত হলেও পরে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়, তাকে অনেকে ‘রঙ্গিন বিপ্লব’ হিসেবে অভিহিত করছেন। এই আন্দোলনের পেছনে জাতিসংঘের বাংলাদেশ কার্যালয়ের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। সূত্রের দাবি, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কর্মকর্তারা সরকারবিরোধীদের প্রত্যক্ষ সমর্থন দিয়ে শেখ হাসিনার নির্বাচিত সরকারের পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের প্রশ্ন তুলেছে।

সহিংসতা ও নৈরাজ্যের পেছনে জাতিসংঘের নীরবতা

জুলাই আন্দোলনের সময় সরকারি স্থাপনা ধ্বংস, জেল ভেঙে জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের মুক্তি, পুলিশ হত্যা, এবং স্নাইপার কিলিংয়ের মতো ঘটনা দেশকে যুদ্ধের পরিস্থিতিতে নিয়ে যায়। সারাদেশে ৪৫০টির বেশি থানায় হামলা, নরসিংদীতে হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে ৮২৬ জন কয়েদির মধ্যে ৯ জন চিহ্নিত জঙ্গির পলায়ন, এবং মহাখালী ও বনানীতে সেতু ভবন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এসব নাশকতার পেছনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মতো সংগঠনের নেতৃত্ব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক এসব নৃশংস ঘটনার বিরুদ্ধে কোনো বক্তব্য দেননি।

২৫ জুলাই ২০২৪-এ প্রকাশিত একটি প্রেস রিলিজে ভলকার টুর্ক আন্দোলনের সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও, সরকারের বিরুদ্ধে একপেশে সমালোচনা করে আন্দোলনকারীদের পূর্ণ সমর্থন দেন। তিনি মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও মিছিল-মিটিংয়ের অধিকার নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন, কিন্তু পুলিশ সদস্যদের নৃশংস হত্যা, যেমন যাত্রাবাড়ীতে ট্যুরিস্ট পুলিশের এএসআই মোহাম্মদ মোক্তাদিরকে হত্যা করে ব্রিজে ঝুলিয়ে রাখা, বনানীতে পুলিশ পরিদর্শক মাসুদ পারভেজ ভুঁইয়ার নির্মম হত্যা, এবং বিটিভি কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা তাঁর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

জাতিসংঘের হুমকি ও সেনাবাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা

জুলাই আন্দোলনের সময় জাতিসংঘের হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে শান্তিরক্ষা মিশন থেকে প্রত্যাহারের হুমকি দেন। ২০২৫ সালের মার্চে বিবিসির হার্ড টক অনুষ্ঠানে তিনি নিশ্চিত করেন, সেনাবাহিনীকে সতর্ক করা হয়েছিল যে, আন্দোলন দমনে জড়িত হলে তারা শান্তিরক্ষা মিশন থেকে বাদ পড়তে পারে। এই হুমকির ফলে সেনাবাহিনী নিষ্ক্রিয় থেকে নৈরাজ্য ছড়াতে সহায়তা করে। শান্তিরক্ষা মিশন থেকে আয়ের লোভে সেনারা তাদের সর্বাধিনায়কের নির্দেশ উপেক্ষা করে, যা দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। সমালোচকরা বলছেন, জাতিসংঘ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে সেনাবাহিনীকে নিরস্ত্র করার চেষ্টা করেছে।

একপেশে মানবাধিকার প্রতিবেদন

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভলকার টুর্কের অফিস জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নির্দেশে তৈরি এই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, জুলাই থেকে আগস্ট ১৫ পর্যন্ত ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। তবে এটি স্পষ্ট নয় যে এই হত্যাকাণ্ডের দায় কার। জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা ৮২০-এর বেশি, এবং অন্তর্বর্তী সরকারের হিসাবে ৮৩৪। প্রতিবেদনে ৫ আগস্টের পরবর্তী হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য বা দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়নি। এছাড়া, আওয়ামী লীগের ওপর হামলা, বাসাবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, এবং মব হামলায় হত্যার ঘটনাগুলো প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি, যা এর একপেশে প্রকৃতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ ও জাতিসংঘের সমর্থন

২০২৫ সালের ১২ মে ড. ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। জাতিসংঘের রেসিডেন্ট কোঅর্ডিনেটর গোয়েন লুইস এই নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করে বলেন, আওয়ামী লীগ ছাড়াও জনগণের অংশগ্রহণে নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে। এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে জাতিসংঘ আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে ইন্ধন জুগিয়েছে। আওয়ামী লীগ ও এর ১৪ দলীয় জোট প্রায় ৫০% ভোটের প্রতিনিধিত্ব করে। এই বিপুল ভোটার বাদ দিয়ে কীভাবে সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন সম্ভব, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

ড. ইউনুসের ধন্যবাদ ও জাতিসংঘের ভূমিকা

২৯ জুলাই ২০২৫-এ জাতিসংঘ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনুস জুলাই আন্দোলনে জাতিসংঘের ভূমিকার জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, “গত বছরের জুলাই-আগস্টের অন্ধকার সময়ে জাতিসংঘ বাংলাদেশের পাশে ছিল।” এই বক্তব্যকে সমালোচকরা জাতিসংঘের হস্তক্ষেপের স্বীকারোক্তি হিসেবে দেখছেন। তারা বলছেন, জাতিসংঘের সমর্থন ছাড়া শেখ হাসিনার পতন সম্ভব হতো না, এবং এর মাধ্যমে ড. ইউনুস ক্ষমতায় এসে পশ্চিমা শক্তির স্বার্থ রক্ষা ও ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক উন্নতি সাধন করছেন।

পশ্চিমা ষড়যন্ত্র ও জনগণের হতাশা

শেখ হাসিনা আগেই দাবি করেছিলেন যে তাঁর সরকারের পতনে পশ্চিমা ষড়যন্ত্র রয়েছে। ৫ আগস্টের পর সেন্ট মার্টিন দ্বীপ ও রাখাইন করিডোরের মতো ইস্যুতে এই ষড়যন্ত্র স্পষ্ট হয়েছে। জনগণ যে আশা নিয়ে জুলাই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল, তা এখন ক্ষীণ হয়ে গেছে। সমালোচকদের মতে, জাতিসংঘ মানবাধিকারের নামে আওয়ামী লীগের ওপর দমন-পীড়নকে বৈধতা দিয়েছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির মতো দলগুলোর ক্ষমতা ধরে রাখার পরিকল্পনায় জাতিসংঘ মূল কুশীলব হিসেবে কাজ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ময়মনসিংহে রোজাদারের মাঝে ইফতার বিতরণ, ইফতার ও দোয়া মাহফিল

1

অন্তর্বর্তী সরকার কি ইচ্ছাকৃতভাবেই আইনের শাসনকে পেছনে ঠেলে দ

2

আইসিটির দুই প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ

3

চীনের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি, হুকির মুখে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব

4

বাংলাদেশের ওপর জঙ্গিবাদের তকমা, গণহারে হচ্ছে ভিসা প্রত্যাখান

5

মবের ওপর ভর করে টিকে আছে ইউনূস বাহিনী

6

নারী নিয়ে বিতর্কিত পোস্ট: সমালোচনায় জামায়াত আমির, পরবর্তীতে

7

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশনকে কানাডা প্রবাসী

8

প্রেস সচিবের মিথ্যাচার এবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল মালয়েশ

9

শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারকে টার্গেট করে রাজনৈতিক সার্কাস দেখা

10

ড. ইউনূস সম্পর্কে বিখ্যাত লেখক আহমদ ছফার সতর্কবার্তা

11

মৃত্যুদণ্ডের আসামি বাবরকে ফিরিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল বানানোর চে

12

আন্তর্জাতিক যুদ্ধবাজদের নতুন থিয়েটার বাংলাদেশ, ঝুঁকিতে সার্ব

13

গাবতলী হাট থেকে শেরাটন: হিযবুত কানেকশন ও হাজার কোটি টাকার অন

14

সেনাবাহিনীতে আরও ৬ কর্মকর্তার রদবদল

15

ওয়াশিংটনে ‘কংগ্রেশনাল ব্রিফিং’: বাংলাদেশের ভোট ‘প্রশ্নবিদ্ধ

16

জুলাই মামলার ভয় দেখিয়ে আড়াই কোটি টাকার বেশি চাঁদাবাজি — নেপথ

17

এপস্টেইনের পাশে থাকা ব্যক্তি কে? চট্টগ্রাম বন্দর ঘিরে উঠছে ব

18

ধানের শীষের মনোনয়ন না পেলে, স্বতন্ত্র পার্থী হিসেবে নির্বাচন

19

কঠিন মুহুর্তে আবারও বাংলাদেশের পাশে ভারত

20