
নিজস্ব প্রতিবেদক
নতুন করে কোটা বিতর্কে উত্তাল বাংলাদেশের চাকরি বাজার। মেধাভিত্তিক নিয়োগের স্বপ্ন দেখিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার এখন নিজেই কোটা-নির্ভর সুবিধাভোগীদের বৃত্তে আটকা পড়ে পড়েছে—এমন অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি আজাহার উদ্দিন অনীক নামের একজন যুবক আইসিটি বিভাগের পলিসি এডভাইজার হিসেবে মাসে ২ লাখ টাকা বেতনে নিয়োগ পেয়েছেন। অথচ জানা গেছে, অনীকের ছয় মাসের চাকরির অভিজ্ঞতাও নেই। তার একমাত্র পরিচয়—সে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর নেতা ছিলেন।
নিয়োগে এই অনৈতিকতা ও রাজনৈতিক সংযোগকে সামনে এনেই সমালোচনার ঝড় উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। অনীকের বিরুদ্ধে ‘মোরাল পুলিশিং’-এর অভিযোগও উঠেছে। দাবি উঠেছে, তিনি নিজে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে এখন অন্যদের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
আন্দোলনের নামে ‘কোটা ব্যবসা’?
২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে দেশে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন হয়, যা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের অন্যতম কারণ ছিল। সেই আন্দোলনের নামেই এখন ‘জুলাই বিপ্লবের শহীদ পরিবার’ ও ‘আহত যোদ্ধাদের’ জন্য সরকারি চাকরিতে অগ্রাধিকার কোটার ঘোষণা দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম জানিয়েছেন, মোট ৮৩৪ জন ‘জুলাই শহীদ’ পরিবারের সদস্য এবং ১২ হাজারের বেশি আহত আন্দোলনকারী ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে বিশেষ স্বীকৃতি পাচ্ছেন। তাদের জন্য রয়েছে মাসিক ভাতা, এককালীন অর্থ সহায়তা, পুনর্বাসন এবং সরকারি চাকরিতে অগ্রাধিকার সুবিধা।
প্রশ্ন উঠছে—আন্দোলনের উদ্দেশ্য কী ছিল?
চাকরিপ্রত্যাশী মেধাবীদের অভিযোগ, যাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছিল, সেই কোটার জায়গায় এখন আরেকটি রাজনৈতিক কোটা গড়ে তোলা হচ্ছে। এক আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আন্দোলনটা করেছিলাম মেধার স্বীকৃতির জন্য। এখন দেখি সেই আন্দোলনের নামেই আবার নতুন করে কোটা চালু হচ্ছে। তাহলে লাভটা কার হলো?”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গণঅভ্যুত্থানকে পুঁজি করে ‘প্রিভিলেজ’-নির্ভর একধরনের নতুন বৈষম্যমূলক নিয়োগব্যবস্থা চালু করেছে ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। মেধাভিত্তিক ন্যায়ের বদলে পরিচয় ও পছন্দ-অপছন্দই এখন নিয়োগের মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এনসিপি নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধেও উঠেছে একের পর এক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ। রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে এনসিপি নেতারা পতিতাবৃত্তিতে ৫১ কোটি টাকা খরচ করেছেন বলে এক টকশোতে অভিযোগ করেন বিএনপিপন্থী সাবেক ছাত্রনেতা মোশারফ আহমেদ ঠাকুর।
এছাড়া ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও তার একান্ত সচিব মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। নগদ থেকে ১৫০ কোটি টাকা বেহাত করার অভিযোগ উঠেছে এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সাবেক একান্ত সচিব আতিক মোর্শেদের বিরুদ্ধে। হিযবুত তাহরীর সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে।
আন্দোলনের ভেতরে ভাঙন
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র উমামা ফাতেমা পদত্যাগ করে বলেন, “সংগঠনের মুখপাত্র হিসেবে যাওয়ার পরেই টের পাই, ‘সংস্কার’, ‘জুলাই’, ‘শহীদ’, ‘আহত’—এসব কেবল মুখের বুলি। আমাদের সাথে ছলনা হয়েছে। কোটা সংস্কারের নামে আরেকটি কোটার জন্ম—এই বাস্তবতা নিয়ে অনেকেই বলছেন, "কোটার জায়গায় কোটা রইল, মেধার হল না জেতা!"
মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন আজও অপূর্ণ, আর তরুণদের সামনে বারবার ফিরে আসছে একটাই প্রশ্ন—“আন্দোলনটা তবে কার জন্য ছিল?”