
নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমাবেশকে কেন্দ্র করে গোপালগঞ্জে বুধবার (১৬ জুলাই) সাধারণ জনগণের সঙ্গে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই সহিংসতায় দীপ্ত সাহা, রমজানসহ সাতজন নিহত এবং অন্তত ৫০ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এরইমধ্যে এই কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে।
সূত্র বলছে, যশোরের জেওসি এমদাদুল ইসলাম গোপালগঞ্জে সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেন। তিনি সাবেক সেনাপ্রধান আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হকের পিএস ছিলেন। এর আগে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল এমদাদুলের বিরুদ্ধে। তখন তার বিরুদ্ধে তদন্তও হয়েছিল। যশোর জেওসি এমদাদুল তার ব্রিগেড কমান্ডার মিজানুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে এই গণহত্যার পরিকল্পনা করেন। আর ঘটনাস্থলে সরাসরি হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন লেফট্যানেন্ট কর্নেল মাবরুর হাসান।
এছাড়া কোটালীপাড়া থানার পুলিশ মো. আবুল কালাম আজাদের নির্দেশ রমজানসহ বেশ কয়েকজনকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি কোটালীপাড়ায় যোগদানের আগে বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কোটালীপাড়াতেই তিনি প্রথমবারের মতো ওসির দায়িত্ব পালন করছেন।
সূত্র আরও জানায়, এই সংঘর্ষ ও অভিযান পরিচালনার পুরো মিশনের নেতৃত্ব দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক ছবিতে দেখা গেছে, তারা পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে পরিস্থিতি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করছেন।
আসিফ মাহমুদ সজীব নিজেও ফেসবুকে লিখেছেন, “সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে এবং নিষিদ্ধ সংগঠনের সন্ত্রাসীদের.... ভেঙে দেওয়া হবে।”
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ঘটনাস্থলে প্রথমে সেনাবাহিনী জনসাধারণকে থামানোর চেষ্টা করে, কিন্তু ব্যর্থ হয়ে তারা পিছু হটে। এরপর আবার ফিরে এসে সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালায়। ঘটনাস্থলে প্রায় শতাধিক পুলিশ সদস্য ফাঁকা গুলি বর্ষণ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুঁড়েছে বলে জানা গেছে।
দেশে জঙ্গি তৎপরতা, মব ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে গোপালগঞ্জে এক ভয়াবহ ও বেদনাদায়ক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এনসিপির ঘোষিত 'মার্চ টু গোপালগঞ্জ' কর্মসূচির পর দলটির শীর্ষ নেতারা সমাবেশ শেষে শহরের একটি এলাকায় সাধারণ মানুষের জনরোষে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। স্থানীয়ভাবে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীর একটি দল মাঠে নামে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সেনাসদস্যরা শুরুতে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করলেও কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করে।
এনসিপির গোপালগঞ্জের পদযাত্রা ও সমাবেশকে ঘিরে মঙ্গলবার (১৫ জুলাই) রাত থেকে সামাজিকমাধ্যমে উত্তেজনা তৈরি হয়। ফেসবুকে এনসিপির নেতারা ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। বুধবার এনসিপির নেতারা গোপালগঞ্জ যাওয়ার পথে পথে বাধা পেয়েছেন। সাধারণ মানুষ পুলিশ ও ইউএনওর গাড়িতেও হামলার ঘটনা ঘটেছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, সামরিক বাহিনী সাধারণত অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার সময় ‘সহায়তাকারী’ শক্তি হিসেবে নামানো হয়, ‘মূল আক্রমণকারী’ হিসেবে নয়। গোপালগঞ্জে সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ গুলিবর্ষণের খবর অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটা যদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে হয়ে থাকে, তাহলে তা অপব্যবহার। আর যদি সেনাবাহিনী নিজস্ব সিদ্ধান্তে এমনটি করে থাকে, তাহলে এর কৌশলগত ও নৈতিক যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে।
তাদের মতে, নিহতদের কারও বিরুদ্ধে অস্ত্রধারী জঙ্গি বা সন্ত্রাসীর অভিযোগ ছিল না। তাহলে কেন গুলি? এই ঘটনায় যারা নির্দেশ দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে স্বাধীন তদন্ত এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা না হলে দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও দৃঢ় হবে।
ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান বৃহস্পতিবার নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, আমি আশা করি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বুধবারের গোপালগঞ্জের সহিংসতার চারজনের মৃত্যুর পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার জন্য একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় তদন্ত করবে। গতকালের মতো আওয়ামী লীগের সহিংসতার সমালোচনা ও নিন্দা করা সরকারের পক্ষে ঠিকই ছিল, কিন্তু অস্পষ্ট পরিস্থিতিতে চারজন নিহত হয়েছেন এবং একটি স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।