
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতে আবারও নেমে এসেছে এক দুঃস্বপ্ন। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আরও একবার পদদলিত হলো জাতীয় দৈনিক জনকণ্ঠ-এর দখল নাটকে। গত শনিবার, স্বনামধন্য এই পত্রিকাটি এক পরিকল্পিতভাবে দখল করে নেয়া হয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একটি অংশের মাধ্যমে।
সূত্র বলছে , জুলাইয়ে নিহতদের স্মরণে জনকণ্ঠ তাদের ব্যানার কালো করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই ঘটনাকে বঙ্গবন্ধুর জন্য শোক উল্লেখ করে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। আর পেছনে ছিল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব এডিটর জয়নাল আবেদীন শিশির, অ্যাডভাইজার (অনলাইন) সাবরিনা বিনতে আহমেদ, ডেপুটি চিফ রিপোর্টার ইস্রাফিল ফরায়েজী (জামায়াত), অনলাইন চিফ ফুয়াদ হাসান, ডিজিটাল প্রধান নুরুজ্জামান, সিনিয়র রিপোর্টার আবদুর রহিম, সিকিউরিটি ইনচার্জ জাহাঙ্গীর আহমেদ। তারা পত্রিকার ব্যানার পরে লাল করে পুরো জনকণ্ঠকে দখলে নেওয়ার চেষ্টা করে। এ ঘটনা জানাজানির পর তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়। পরে বহিরাগতদের জনকণ্ঠে প্রবেশ করিয়ে মব তৈরি করে পত্রিকাটি জামায়াত-এনসিপি স্টাইলে দখল নেওয়া হয়।
বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এক গভীর সংকটে পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের চাপ, মব ভায়োলেন্স এবং সাংবাদিকদের ওপর অনবরত হুমকির কারণে দেশের সংবাদমাধ্যম কার্যত প্যারালাইজড হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল থেকে সাংবাদিক ছাঁটাই, এক্রিডিটেশন বাতিল, নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ ও রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে মিডিয়া ব্যবহার—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সংবাদপত্র ও সম্প্রচারমাধ্যমগুলোর স্বাধীনতার ওপর এক ঘনীভূত কালো মেঘ জমেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সময় টিভি থেকে চাকরিচ্যুত হন প্রধান বার্তা সম্পাদক মুজতবা দানিশ, চিফ আউটপুট এডিটর লোপা আহমেদ ও অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর খান মুহাম্মদ রুমেল। আরেক দফা চাপ আসে ১৮ ডিসেম্বর, যখন রাজনৈতিক নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ সিটি গ্রুপের এমডির সঙ্গে দেখা করে ১০ জনের নাম সম্বলিত একটি তালিকা দেন এবং তাদের চাকরিচ্যুতির জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। অর্থাৎ মব ভায়োলেন্সের হুমকি দেন। একই দিন তালিকাভুক্ত পাঁচজনকে পদত্যাগ করতে বলার পর হোয়াটসঅ্যাপে তাদের বরখাস্তের নোটিশ পাঠানো হয়।
গণমাধ্যমের ওপর নিপীড়নের আরেক দৃষ্টান্ত দেখা যায় ২৯ এপ্রিল, সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব ঘিরে। পরদিন দীপ্ত টিভি তাদের প্রধান খবরের বুলেটিন বন্ধ রাখে এবং সিনিয়র ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট মিজানুর রহমানকে চাকরিচ্যুত করে। একই ঘটনার জেরে এটিএন বাংলা বরখাস্ত করে ফজলে রাব্বীকে এবং চ্যানেল আই অব্যাহতি দেয় রিপোর্টার রফিকুল বাসারকে।
একের পর এক এসব ঘটনায় প্রতীয়মান হচ্ছে, সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করার সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে তথ্য অধিদপ্তর (পিআইডি) ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে নভেম্বরের মধ্যে ১৬৭ জন সাংবাদিকের এক্রিডিটেশন বাতিল করে। আন্তর্জাতিক সংস্থা এইচআরডব্লিউ জানায়, জুলাইয়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা ঘিরে ১৪০ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের হয় এবং ১৫০ জনের অ্যাক্রিডিটেশন বাতিল করা হয়। রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়েছে ১৯ জনের বিরুদ্ধে।
এ পরিস্থিতির মধ্যে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারীদের পক্ষে প্রচারেও ব্যবহার হচ্ছে মিডিয়া। ঈদুল আজহার দিনে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সামনে এক ব্যক্তির “স্যার, আপনাকে পাঁচ বছর চাই” বক্তব্য ছিল সুপরিকল্পিত। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের সাজানো নাটক। ভিডিওটি ড. ইউনুসের প্রেস সচিব শফিকুল ইসলাম পোস্ট করার পর গণমাধ্যমে তা জোরপূর্বক ছড়ানো হয়।
এই দৃশ্যমান কৌশল মূলত জনসমর্থন তৈরি ও আস্থা পুনরুদ্ধারে এক ব্যর্থ প্রচেষ্টা হিসেবেই বিবেচিত হয়েছে। ধর্মীয় উৎসব ও ঈদগাহের মতো পবিত্র মঞ্চ ব্যবহার করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের এই প্রচেষ্টা সমালোচিত হয়েছে বিভিন্ন মহলে।
সাংবাদিকরা আজ স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করতে ভয় পান। চাকরি হারানো, মামলা, তদন্ত, হেনস্তা কিংবা লাইসেন্স বাতিলের ভয় তাদের বাকরুদ্ধ করে রাখছে। এর ফলাফল শুধু মিডিয়ার নয়—গণতন্ত্রেরও।
বাংলাদেশে গণমাধ্যম আজ আর কেবল সত্য তুলে ধরার মাধ্যম নয়—তা হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক চাপ, ভয়ের সংস্কৃতি ও নিয়ন্ত্রণের শিকার এক পরনির্ভর প্ল্যাটফর্ম। যেখানে প্রশ্ন করার অপরাধে সাংবাদিককে চাকরি হারাতে হয়, সেখানে স্বাধীনতা কেবল এক অলীক ধারণা।
সাংবাদিকতার মৌলিক চেতনা—জনগণের পক্ষে প্রশ্ন তোলা, সত্যের পেছনে ছোটা—আজ সেই চেতনা ভূলুণ্ঠিত। মামলা, চাকরিচ্যুতি, এক্রিডিটেশন বাতিল, রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ—এসবই সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধের আধুনিক অস্ত্র হয়ে উঠেছে। আর মব ভায়োলেন্স ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ যে মাত্রায় বিস্তৃত হয়েছে, তাতে সংবাদমাধ্যম কার্যত পক্ষাঘাতগ্রস্ত।