
নিজস্ব প্রতিবেদক:
জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ সদস্যদের উপর নির্মম হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জাতি শোকাভিভূত। এই সময়ে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গকারী পুলিশ সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর মুহূর্তে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) সাইফুল ইসলামের একটি বক্তব্য ব্যাপক ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিয়েছে।
একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট ছড়িয়ে জুলাই ঐক্য বিনষ্ট করা হচ্ছে। আপনারা ষড়যন্ত্রকারীদের বলে দেবেন, আপা আর আসবে না, কাকা আর হাসবে না।” এই বক্তব্য নিহত ও আহত পুলিশ সদস্যদের পরিবারের কাছে অসম্মানজনক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। বিশেষ করে, সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় ৪ আগস্টের বর্বরোচিত হামলায় নিহত ১৫ পুলিশ সদস্যের পরিবার প্রশ্ন তুলেছে—তাদের প্রিয়জনদের আত্মত্যাগ কেন এভাবে অবমাননার শিকার হচ্ছে?
এনায়েতপুর থানায় নৃশংস হত্যাকাণ্ড
সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় জঙ্গি কায়দায় হামলা চালিয়ে ১৫ পুলিশ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, হামলাকারীরা থানায় প্রবেশ করে পুলিশ সদস্যদের পিটিয়ে, মাথা থেঁতলে হত্যা করে। একটি লাশকে গাছে দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়, যা মানবতার প্রতি চরম অবমাননার প্রতীক। আটটি লাশ স্থানীয় মসজিদের পাশে স্তূপ করে রাখা হয়, যাদের অধিকাংশের পোশাক খুলে ফেলা হয়েছিল। তিনজনের লাশ পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়। স্থানীয় বাসিন্দা জহির উদ্দিন (৭৫) বলেন, “হামলাকারীরা জঙ্গল থেকে পালিয়ে থাকা পুলিশ সদস্যদের খুঁজে বের করে লাঠি ও লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। কেউ পুকুরে ঝাঁপ দিলেও তাদের পানিতে নেমে হত্যা করা হয়।”
নিহত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ছিলেন ওসি আব্দুর রাজ্জাক, এসআই রইস উদ্দিন খান, তহছেনুজ্জামান, প্রনবেশ কুমার বিশ্বাস, নাজমুল হোসাইন, আনিসুর রহমান মোল্লা, এএসআই ওবায়দুর রহমান, কনস্টেবল আব্দুস সালেক, হাফিজুর ইসলাম, রবিউল আলম শাহ, হুমায়ুন কবির, আরিফুল ইসলাম, রিয়াজুল ইসলাম, শাহিন উদ্দিন এবং হানিফ আলী। অভিযোগ রয়েছে, নারী কনস্টেবল রেহেনা পারভীন শারীরিক নির্যাতন ও শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছেন।
হামলার নেপথ্যে জঙ্গি ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, হামলাকারীদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের কর্মীরা ছিলেন, যাদের বেশিরভাগের বয়স ১৭ থেকে ২২ বছর। তারা দেশীয় অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে থানায় আক্রমণ চালায় এবং থানার মূল ভবন ও ওসির সরকারি বাসভবনে অগ্নিসংযোগ করে। পুলিশ সূত্র জানায়, হামলাকারীদের মধ্যে স্থানীয় নয় এমন কিছু অচেনা ব্যক্তিও ছিলেন, যাদের কর্মকাণ্ড জঙ্গিদের মতো।
দেশব্যাপী থানায় হামলা ও অস্ত্র লুট
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর দেশের ৬৬৪টি থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ৫,৭৫০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৬ লাখ ৫১ হাজার ৬০৯টি গোলাবারুদ লুট হয়, যার মধ্যে চায়না রাইফেল, শটগান, এসএমজি, এলএমজি, পিস্তল, গ্যাসগান, কাঁদানে গ্যাস লঞ্চার ও সাউন্ড গ্রেনেড রয়েছে। এই অস্ত্র ও গোলাবারুদ জেলপলাতক আসামি, সন্ত্রাসী ও চরমপন্থীদের হাতে চলে যাওয়ায় দেশের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে।
ভয়াবহ আক্রান্ত হওয়া থানাগুলোর মধ্যে রয়েছে ডিএমপির যাত্রাবাড়ী, খিলগাঁও, টাঙ্গাইলের গোড়াই হাইওয়ে, বগুড়ার সদর, দুপচাঁচিয়া, শেরপুর, জয়পুরহাট সদর, কুমিল্লার ইলিয়টগঞ্জ হাইওয়ে, রংপুরের গঙ্গাচড়া, মিঠাপুকুর, পীরগাছা, পীরগঞ্জ, বদরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর, আশুগঞ্জ, সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর, উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, হবিগঞ্জের মাধবপুর ফাঁড়ি এবং ময়মনসিংহ রেঞ্জ অফিস।
নিহতদের পরিবারের ক্ষোভ ও তদন্তে শ্লথগতি
নিহত পুলিশ সদস্যদের পরিবার অভিযোগ করেছে, তাদের প্রিয়জনদের মৃত্যুর সঠিক তথ্য ও সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত সান্ত্বনা না পাওয়ায় তাদের মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি হয়েছে। কিছু সূত্র দাবি করছে, আন্দোলনের সময় জামায়াত-শিবিরের জঙ্গিরা ৩ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্যকে হত্যা করেছে, যদিও পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা ৪৪। তদন্তে অগ্রগতি কম থাকায় পুলিশের দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
'একটা ফোনও আসেনি'
নিহত এক পুলিশ সদস্যের মা বলেন, “আমার ছেলে দেশের জন্য প্রাণ দিল। আজ পর্যন্ত কেউ খোঁজ নেয়নি। উল্টো শুনছি পুলিশদের নিয়েই কটূক্তি হচ্ছে। এটা কেমন দেশ?”
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও ন্যায়বিচার কবে?
সূত্র বলছে, শুধু জুলাই-আগস্ট মাসেই সহিংসতায় ৪৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। কিছু গণমাধ্যম দাবি করছে, প্রকৃত সংখ্যা তিন হাজারের ঘরে। কিন্তু জুলাই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা নেতৃত্ব ও প্রশাসনের অনেকে এখনও এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে মুখ খোলেননি।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস মঙ্গলবার ‘৩৬ জুলাই উদ্যাপন’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করলেও পুলিশ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে কোনো বক্তব্য রাখেননি।
পুলিশ কি শুধুই রাজনৈতিক তর্কের উপাদান?
নিহতদের পরিবার, সহকর্মী ও মানবাধিকারকর্মীরা প্রশ্ন তুলছেন—রাষ্ট্র যখন তাদের পক্ষ নেয় না, তখন পুলিশ সদস্যরা কাদের জন্য জীবন দিচ্ছেন? একজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “পুলিশের জীবন নিয়ে যদি এইভাবে কথা বলা হয়, তাহলে তরুণরা আর এ পেশায় আসতে চাইবে না।”
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে দেশের জন্য জীবন দেওয়া পুলিশ সদস্যদের আত্মত্যাগ অবিস্মরণীয়। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি জানিয়ে জাতির প্রতি আহ্বান—এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ঐক্যবদ্ধ হোন। স্বাধীনতাবিরোধী জঙ্গি শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পুলিশ সদস্যদের সম্মান রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।