নিজস্ব প্রতিবেদক
‘মব’ শব্দটির অর্থ—উচ্ছৃঙ্খল জনতা। যখন সাধারণ মানুষ আইনের আশ্রয় না নিয়ে নিজের হাতে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করে, তখন তা পরিণত হয় ‘মব জাস্টিসে’। এটি এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা, যা সামাজিক বিচারে কোনোভাবেই বৈধ নয়।
বিশ্বজুড়েই ‘মব জাস্টিস’ একটি ভয়ংকর সামাজিক সমস্যা। তবে বাংলাদেশে এটি এখন যেন ‘নতুন স্বাভাবিকতা’। বিচারহীনতার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক উসকানি, এবং প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা মিলে এমন একটি বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে হঠাৎ করেই উত্তেজিত জনতা কাউকে পিটিয়ে হত্যা করছে, কারও বাড়িতে হামলা করছে, কিংবা কাউকে বিবস্ত্র করে ভিডিও করছে।
২০২৪–২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে মব সহিংসতার হার ভয়াবহভাবে বেড়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাবে, মাত্র ১০ মাসে ২৫৩টি মব সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১৬৩ জন এবং আহত হয়েছেন ৩১২ জন। শুধু ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে গণপিটুনির ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬৭ জন এবং আহত ১১৯ জন। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪৭৬ জন নারী ও শিশু, যাদের মধ্যে ২৯২ জনই ১৮ বছরের কম বয়সী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের সহিংসতা শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নয়, বরং সাধারণ নাগরিককেও আতঙ্কিত করছে। নির্বাচনের আগে এমন সহিংস পরিবেশে ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারবে না। ফলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধই থেকে যাবে।
প্রোপাগান্ডা চক্র
বাংলাদেশে মধ্যরাত ঘনালেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হয়ে ওঠে একটি সংঘবদ্ধ প্রোপাগান্ডা চক্র। ফেসবুক স্ট্যাটাস, ইউটিউব ভিডিও ও অন্যান্য মাধ্যমে ছড়ানো হয় বিভ্রান্তিকর তথ্য, গুজব ও উসকানিমূলক বক্তব্য। এই চক্রের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিন বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব—কনক সারওয়ার, পিনাকী ভট্টাচার্য ও ইলিয়াস হোসেন। তারা বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন এবং দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্যের জন্য পরিচিত।
তাদের পরিচালিত সামাজিক মাধ্যম চ্যানেলগুলো থেকে গভীর রাতে শুরু হয় রাষ্ট্রবিরোধী গুজব ও প্ররোচনা ছড়ানোর অপচেষ্টা। এরপরই কাজ শুরু করে দেশীয় একদল সুযোগসন্ধানী মানুষ—যারা এই স্ট্যাটাসগুলো শেয়ার করে জনতাকে খেপিয়ে তোলে। আর তারপর গড়ে ওঠে ‘মব’।
এই সংঘবদ্ধ কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য—জনমনে ভয়, বিভ্রান্তি এবং অরাজকতা তৈরি করে প্রশাসনকে কোণঠাসা করা এবং নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করা।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ষড়যন্ত্র
বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সহিংসতা ও মব জাস্টিসের ঘটনাগুলোর পেছনে রয়েছে সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। অভিযোগ রয়েছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রত্যক্ষ মদতে জামায়াত ও নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীর এনসিপি, ছাত্র জনতা এই মব জাস্টিস চালিয়ে যাচ্ছে।
নির্বাচনী পরিবেশ অস্থিতিশীল করতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে উসকানিমূলক ঘটনার জন্ম দেওয়া হচ্ছে। জামায়াত-হিযবুত ও ইউনূস নেতৃত্বাধীন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এ ধরনের উত্তেজনা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইনকিলাব মঞ্চ ও জুলাই ঐক্য নামের প্ল্যাটফর্মগুলোও রয়েছে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে।
ঘটনা বলছে, সিরাজগঞ্জে রবীন্দ্র কাছারিবাড়িতে হামলা, গাজীপুরে সাবেক মন্ত্রীর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ কিংবা বঙ্গবন্ধু ভবন আক্রমণ—এসব কিছুই কেবল ভাঙচুর নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও সংস্কৃতির উপর সরাসরি আঘাত।
শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ও এই সহিংসতার শিকার হচ্ছে। ২০২৪ সালের আগস্টের ৫ থেকে ২০ তারিখের মধ্যে দেশের ৪৯ জেলায় সংখ্যালঘুদের অন্তত ১,০৬৮টি ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি
ঢাকার ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর বাড়ি ধ্বংস, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার নূরুল হুদার বাসায় হামলা কিংবা এক নারী বিচারককে প্রকাশ্যে লাঞ্ছনা—সব কিছুই প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় প্রশাসন কার্যত নিষ্ক্রিয়। পুলিশ এসব ঘটনার সময় উপস্থিত থাকলেও অনেক সময় কোনো হস্তক্ষেপ করে না।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় বহু সাধারণ মানুষ ও প্রাক্তন কর্মকর্তা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। শেরপুরে ছাত্রলীগ নেতা শাকিলের পা কেটে নেওয়া, মাগুরায় কমিরুল মোল্যাকে জীবন্ত কবর দেওয়া, যশোরে প্রতিবন্ধীকে পিটিয়ে হত্যা—এই ঘটনাগুলো আইনের শাসনের সম্পূর্ণ বিপরীত দিক তুলে ধরে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাদের মতে, এটি ‘জনরোষ’—কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি পরিকল্পিত সহিংসতা। মব নয়, এটি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল—যার লক্ষ্য নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা ও একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে জাতিকে ঠেলে দেওয়া।
মব রাজত্বের পরিসংখ্যান ও বিস্তার
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম চার মাসেই দেশে ১,২৪৬টি হত্যাকাণ্ড, ৯,১০০টি নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা এবং ১,১৩৯টি ডাকাতি ও দস্যুতার মামলা হয়েছে। গত ১০ বছরে মব জাস্টিসে ৭৯২ জন প্রাণ হারিয়েছেন—যাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে ২০২৪ সালে।
গত বছরের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর থেকে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের বহু নেতাকর্মীকে মব তৈরি করে হত্যা করা হয়েছে। এর অনেক ঘটনা গণমাধ্যমে আসেনি।
বিশেষ করে, হা-মীম গ্রুপের এমডি এ কে আজাদের বাড়িতে হামলা, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের ওপর হামলার চেষ্টা, নারায়ণগঞ্জে বিবস্ত্র করে মারধর, কুমিল্লায় তিনজনকে হত্যা, ঢাকায় ধর্ষণের ভিডিও ছড়িয়ে মারধর—এসব ঘটনায় নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে সহিংসতা।
মবের পক্ষে সরকার
জাতীয় নাগরিক পার্টির দক্ষিণাঞ্চলীয় নেতা হাসনাত আবদুল্লাহও বলেন, “মব নয়, এটা জনরোষ। যারা বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি করেছে, তাদের বিচার না হওয়াতেই এই ক্ষোভ।”
সাবেক বিএনপি নেতা ও বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “মবের ঘটনাগুলো বিচার বিভাগের প্রতি অনাস্থা নয়, বরং গত ১৭ বছরের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।” তার এই বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার কর্মীরা, যাদের মতে, এমন মন্তব্য রাষ্ট্রীয় সহিংসতাকে বৈধতা দেয়।
২৬ জুন রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এক সেমিনারে প্রেস সচিব বলেন, “বলা হচ্ছে মব তৈরি হচ্ছে, আমি এটাকে মব বলছি না, বলছি প্রেসার গ্রুপ। সেটা তৈরি হচ্ছে সাংবাদিকতার ব্যর্থতার কারণে।”
তিনি অভিযোগ করেন, ১৫ বছরের সরকারে থাকা অবস্থায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ এবং রাষ্ট্রীয় হিংস্রতা জন্ম দিয়েছে বর্তমান ‘ভয়ের সংস্কৃতি’। এর মধ্যে এক ধরনের জনরোষ জমে উঠে মব হিসেবে প্রকাশ পাচ্ছে।
বাংলাদেশ এখন এক ধরনের হাইব্রিড অরাজকতার মুখোমুখি—যেখানে প্রোপাগান্ডা, গুজব, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, "সন্ত্রাস যে করে, তার ঘৃণা যেন তৃণসম দহে"—এই নীতিতে ফিরতে না পারলে সহিংসতা আরও বাড়বে, আর গণতন্ত্র আরও সংকুচিত হবে।
প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, মিডিয়া ও নাগরিক সমাজ—সব পক্ষের এখন প্রয়োজন সচেতনতা, দায়িত্বশীলতা ও দ্রুত পদক্ষেপ। নইলে, এই 'মব' কেবল একটি শব্দ নয়—এটি হয়ে উঠবে জাতির ভবিষ্যতের অভিশাপ।
মন্তব্য করুন